নিজস্ব প্রতিবেদক : মেডিকেল বোর্ডের সুপারিশ অনুযায়ী কারাবন্দি খালেদা জিয়াকে চিকিৎসার জন্য শিগগিরই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) নেয়া হবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল।

মঙ্গলবার সচিবালয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্বে ৬ সদস্যবিশিষ্ট প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠকের পর সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান তিনি। দু’টি দুর্নীতি মামলায় কারাবন্দি খালেদা জিয়ার সুচিকিৎসার দাবি নিয়ে এসেছিলেন বিএনপির প্রতিনিধি দলটি।

বিএনপির প্রতিনিধি দল একটি চিঠি হস্তান্তর করেছে জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘এই চিঠির সারমর্ম ছিল এই রকম যে, বিএনপির চেয়ারপারসনের চিকিৎসার প্রয়োজন। সেই দাবি নিয়েই তারা আসছিলেন।’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘বিএনপি চেয়ারপারসন যখন অন্তরীণ হলেন তখন আমরা তাকে জেল কোড অনুযায়ী যা যা করার সর্বোচ্চ ব্যবস্থা করেছি। তাকে একজন মহিলা অ্যাটেনডেন্সও দিয়েছি। আমরা তাকে বিএসএমএমইউতে পাঠিয়েছিলাম, চিকিৎসা শেষে হাসপাতাল রিলিজ করলে আমরা তাকে নিয়ে আসি। আপনারা এও জানেন, হাইকোর্টের মাধ্যমে একটি বোর্ড করে দেয়া হয়েছিল, এই বোর্ড তার চিকিৎসায় সব ধরনের খোঁজ-খবর রাখবে এবং ব্যবস্থা নেবে।’

তিনি বলেন, ‘এই বোর্ড গত ২৪ ফেব্রুয়ারি কারাগারে তাকে (খালেদা জিয়া) ভিজিট করেছে এবং তারা কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষার কথা বলেছেন। পরীক্ষা-নীরিক্ষার জন্য তাকে আবারও বিএসএমএমইউতে পাঠানোর কথা বলেছেন। ওখানে এই পরীক্ষাগুলো করার জন্য বলেছেন।’

‘বোর্ড যেভাবে সিদ্ধান্ত দিয়েছে সে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি। প্রয়োজনে তাকে আবারও বিএসএমএমইউতে পাঠাব চিকিৎসার জন্য’ বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

বিএনপি প্রতিনিধি দল আবারও চিকিৎসার জন্য বেগম জিয়াকে ইউনাইটেড হাসপাতালে পাঠানোর কথা বলেছেন জানিয়ে আসাদুজ্জামান খান বলেন, ‘আমরা আগের মতো সেটিই বলেছি- কোর্ট থেকে যে ডিরেকশন আমাদের কাছে আসছে, বোর্ড যে সিদ্ধান্ত দেবে সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আমরা ব্যবস্থা নেব। কাজেই বিএসএমএমইউতে পাঠাচ্ছি সেখানে বোর্ড দেখবে, বোর্ড যা প্রয়োজন মনে করবে সেই ধরনের চিকিৎসাই আমরা তাকে দেব।’

বেগম জিয়াকে কবে নাগাদ হাসপাতালে পাঠানো হবে- জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, ‘শিগগিরই পাঠাব। আমরা আইজি প্রিজনকে বলে দেব বোর্ড যেভাবে বলে ঠিক সেভাবেই তাকে যেন বিএসএমএমইউতে পাঠানো হয়।’

সুনির্দিষ্ট করে কবে পাঠাবেন তা বলা যায় কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘সুনির্দিষ্টভাবে তো আমরা বলতে পারব না। কারণ তিনি কতখানি অসুস্থ চিকিৎসা প্রয়োজন কতটুকু…একজন এফসিপিএস ডাক্তার একদিন পর পর তাকে দেখছেন, সেটিও কিন্তু হচ্ছে। তারা যখনই প্রয়োজন মনে করবেন তখনই চলে যাবেন। এখানে সুনির্দিষ্ট করার কিছু নেই। যে সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার কথা বলা হয়েছিল, সেগুলোর জন্য তাকে পাঠাতে হবে, সেটা আমরা পাঠিয়ে দিচ্ছি। আমরা খুব শিগগিরই পাঠিয়ে দেব।’

ডাক্তার বেগম জিয়ার শারীরিক অবস্থার বিষয়ে কী বলছে- জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, ‘ডাক্তাররা বলছেন- বোর্ড থেকে নির্দেশনা দিয়েছেন, কিছু কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষার কথা তারা বলেছেন। সেই পরীক্ষা-নিরীক্ষাগুলো হয়তো কারা অভ্যন্তরে করা সম্ভব হবে না। সেজন্য তাকে বঙ্গবন্ধু হাসপাতালে নিয়ে যাব, তার যাতে সুচিকিৎসা হয় সেই ব্যবস্থাটা আমরা করব।’

asaduzzaman

বিএনপি নেতারা বেগম জিয়াকে চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠানোর কোনো দাবি জানিয়েছেন কিনা- এ বিষয়ে আসাদুজ্জামান খান বলেন, ‘দেখুন আমি তো আগেই বলেছি, হাইকোর্ট থেকে একটি বোর্ড নির্ধারণ করে দিয়েছে। বোর্ড যা বলবেন আমরা সেটাই ফলো করব। এটা কোর্টের নির্দেশনা।’

আপনাদের আশ্বাসে বিএনপি সন্তুষ্ট কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, ‘আপনারাই তো কথা বলেছেন। আমরা এমন কিছু তো বলিনি যে আমরা কিছু করব না।’

বিএনপি মহাসচিবের নেতৃত্বে বেলা ২টা ২৫ মিনিটে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দফতরে প্রবেশ করেন ৬ সদস্যের প্রতিনিধি দল। ৩টা ৫ মিনিটে শেষ হয় বৈঠক।

প্রতিনিধি দলে ছিলেন- বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মির্জা আব্বাস, আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান ও আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

বৈঠক শেষে বেরিয়ে যাওয়ার সময় ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘আমরা বেগম খালেদা জিয়ার অসুস্থতার বিষয়ে এবং তার সুচিকিৎসার জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে এসেছিলাম। তিনি আমাদের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনেছেন। বলেছেন- তার (বেগম জিয়া) সুচিকিৎসার জন্য যা করার তিনি তা করবেন। আমরা মনে করি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তার কথা রাখবেন এবং তিনি বেগম খালেদা জিয়ার চিকিৎসার জন্য সর্বোচ্চ ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।’

গত বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি বেগম জিয়া কারাবন্দি হওয়ার পর থেকে বিভিন্ন সময়ে বিএনপির পক্ষ থেকে অভিযোগ তোলা হয়, কারাগারে তাদের চেয়ারপারসনের যথাযথ চিকিৎসা হচ্ছে না। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, জেল কোড অনুযায়ী খালেদা জিয়াকে সর্বোচ্চ চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। বিএনপি তার অসুস্থতা নিয়ে রাজনীতি করছে।

গত ২৬ ফেব্রুয়ারি সংবাদ সম্মেলনে মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অভিযোগ করেন, দ্বিতীয় দফা চিকিৎসা শেষে কারাগারে ফিরিয়ে নেয়ার পর তিন মাসের বেশি সময় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কোনো চিকিৎসা পাচ্ছেন না।

নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং চিকিৎসা না দেয়ায় খালেদার রোগগুলো মারাত্মক রূপ নিয়েছে বলেও সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেন বিএনপি মহাসচিব। খালেদা জিয়ার কোনো ক্ষতি হলে এর দায় সরকারকেই নিতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

খালেদা জিয়ার সুচিকিৎসা নিশ্চিতের দাবিতে এর আগে গত বছরের ২২ এপ্রিল ও ৯ সেপ্টেম্বর বিএনপির সিনিয়র নেতারা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন। দু’বারই তারা বেগম জিয়াকে ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসার দাবি জানিয়েছিলেন।

সরকারের পক্ষ থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতাল ও সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসা নেয়ার প্রস্তাব দেয়া হলে খালেদা জিয়া তা প্রত্যাখ্যান করেন।