ক্রীড়া প্রতিবেদক::
তারাও জাতীয় দলে খেলেছেন। টেস্ট আর ওয়ানডেতে বাংলাদেশের হয়ে ব্যাট ও বল হাতে দ্যুতিও ছড়িয়েছেন। কিন্তু বয়স মধ্য ত্রিশ ছুঁতেই বাস্তবতা মেনে খেলা ছেড়ে কোচিংকে পেশা হিসেবে নিয়েছেন। আর তাই এক সময়ের জাতীয় দলের ক্রিকেটার ফয়সাল হোসেন ডিকেন্স, তালহা জুবায়ের, আফতাব আহমেদ আর রাজিন সালেহ এখন প্রশিক্ষক।

আর মাত্র ৪ দিন পর (আগামী ১০ অক্টোবর বৃহষ্পতিবার) থেকে যে জাতীয় লিগ শুরু হচ্ছে, তাতে তালহা জুবায়ের, আফতাব আহমেদ ও রাজিন সালেহকে কোচ হিসেবে দেখা যাবে। তাও সহকারী কোচ বা বোলিং, ফিল্ডিং, ব্যাটিং কোচ হিসেবে নয়- সরাসরি হেড কোচের দায়িত্ব পালন করবেন এই তিন সাবেক জাতীয় ক্রিকেটার। তালহা জুবায়ের কোচিং করাবেন ঢাকা মেট্রোকে, চট্টগ্রামের প্রশিক্ষক আফতাব আর রাজিন সালেহ তার নিজ বিভাগ সিলেটকে প্রশিক্ষণ দেবেন।

অথচ তাদেরই সমবয়সী, একসঙ্গে জাতীয় দলে খেলা তুষার ইমরান, মোহাম্মদ আশরাফুল, আব্দুর রাজ্জাকরা এখনও খেলে যাচ্ছেন। এবারের জাতীয় লিগেও খেলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন এবং বিপ টেস্টও দিয়েছেন।

এই সিনিয়র ক্রিকেটারের খেলার যথার্থতা নিয়েই উঠেছে প্রশ্ন। সচেতন ক্রিকেট অনুরাগীদের কথা, ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেটে সর্বাধিক রান, সেঞ্চুরি ও হাফসেঞ্চুরির মালিক তুষার ইমরান। দেশের ক্রিকেট ইতিহাসের সব সময়ের অন্যতম সেরা ব্যাটসম্যান এবং সর্বকনিষ্ঠ টেষ্ট সেঞ্চুরিয়ান মোহাম্মদ আশরাফুল। দেশের ক্রিকেট ইতিহাসের সব সময়ের অন্যতম সেরা স্পিনার আব্দুর রাজ্জাক আর পুরনো বলে অসাধারণ কারুকাজ দেখানোর প্রতিভাসমৃদ্ধ মোহাম্মদ শরীফের এখন খেলা ছেড়ে কোচিংকেই পেশা হিসেবে বেছে নেয়া উচিৎ।

শুধু সচেতন ক্রিকেট অনুরাগীরাই নন, দেশের ক্রিকেটের ভবিষ্যত চিন্তা যারা করেন, জাতীয় দল, বয়সভিত্তিক দল ও হাই পারফরমেন্স ইউনিটের পরিচালনা, তত্বাবধান ও পরিচর্য্যার নীতি নির্ধারক যারা- সেই আকরাম খান, খালেদ মাহমুদ সুজন ও নাইমুর রহমান দুর্জয়রাও তাই মনে করেন। জাগো নিউজের সঙ্গে আলাপে আকরাম খান ও খালেদ মাহমুদ সুজন সে কথাই জানিয়েছেন।

তাদের দুজন প্রায় একই সুরে কথা বলেছেন। আকরাম ও সুজনের মূল কথা হলো, তারা মানে বিসিবি এবং ক্রিকেট অপারেশন্স, গেম ডেভেলপমেন্ট কমিটির পক্ষ থেকে তো আর কাউকে খেলা ছাড়ার কথা বলা যায় না। কাউকে জোর করে বা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে খেলা ছাড়ার এখতিয়ার নেই বোর্ডের। তবে কেউ খেলা ছেড়ে কোচিং, দল ব্যবস্থাপনা, ট্রেনার, কম্পিউটার অ্যানালিষ্ট হতে চাইলে বোর্ড তাকে সহযোগিতা করবে- এমন আশ্বাসও আছে তাদের কন্ঠে।

ক্রিকেট অপারেশন্স কমিটি প্রধান আকরাম খান বলেন, ‘আমরা তো আর কাউকে ঘরোয়া ক্রিকেট বিশেষ করে জাতীয় লিগ, বিসিএল খেলা থেকে বিরত থাকার কথা বলতে পারি না। তবে এটা ঠিক, যারা মধ্য ত্রিশে পা দিয়ে ফেলেছে, তাদের খেলা ছেড়ে কোচিংয়ে আসা মঙ্গলজনক।’

কারো নাম না উল্লেখ করে আকরাম বলেন, ‘যারা জাতীয় দলের হয়ে খেলেছে, তাদের আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা আছে। তারা জানে টেস্ট আর ওয়ানডের মেজাজ, ধরন ও গতিপ্রকৃতি কেমন? তারা যদি কোচিং করায় তাহলে তাদের সেই আন্তর্জাতিক খেলার বাস্তব জ্ঞান ও ধারণা শেয়ার করতে পারবে। এতে পরবর্তী প্রজন্ম জাতীয় দলে খেলার আগে বয়সভিত্তিক ও হাই পারফরমেন্স ইউনিট থেকেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট সম্পর্কে একটা স্বচ্ছ ধারণা পাবে। তাতে করে তাদের ক্যারিয়ারও হবে উন্নত।’

এদিকে গেম ডেভেলপমেন্ট কমিটির চেয়ারম্যান খালেদ মাহমুদ সুজন জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি যাদের বয়স ৩৫ বা তার বেশি হয়ে গেছে তাদের নিজের বোধ, উপলব্ধি একান্তই জরুরী। তাদের পক্ষে আর টেস্ট খেলা সম্ভব কি সম্ভব না? এটা নিজেরই বুঝতে হবে। যত তাড়াতাড়ি এটা বুঝবে এবং খেলা ছেড়ে কোচিং, ট্রেনিং এবং টিম ম্যানেজমেন্টে জড়িত হবার ইচ্ছে পোষণ করবে তারাই বুদ্ধিমানের কাজ করবে। ভবিষ্যতে তারা ক্রিকেট কর্মকান্ডেও জড়িত থাকতে পারবে।’

সুজনও আরও বলেন, ‘আমি সব সময় চাই এবং বিশ্বাস করি যারা জাতীয় দলের হয়ে খেলেছে তাদের অভিজ্ঞতার ভান্ডার অনেক সমৃদ্ধ। নিজের মেধা, প্রজ্ঞার বাইরে তাদের অভিজ্ঞতার ভান্ডারও সমৃদ্ধ। তারা যদি সময় মত খেলা ছেড়ে কোচিংসহ টিম ম্যানেজমেন্টে জড়িত হতে চায়, সেটাই বেশি ভালো।’

সুজন বলেন, ‘আমি যদিও আশরাফুল, রাজ্জাক আর শরীফের সঙ্গে সরাসরি এসব ব্যাপারে কথা বলতে পারিনি। তবে এটা সত্যি যে ওরা খেলা ছেড়ে যদি কোচিংকে করাতে চায়- তাহলে অবশ্যই আমরা মানে বোর্ড তাদের পাশে দাঁড়াবে। এখন ওদের ইচ্ছেটাই সব থেকে বড়। ওরা যদি মনে করে এখনো খেলা চালিয়ে যাব, তাহলে আমরা তো আর জোর করে খেলা বন্ধ করতে যাব না। ওদেরই বুঝতে হবে, কখন থামতে হবে আর কী করতে হবে? আমি এটুকু বলতে পারি যে সব জাতীয় দলের সাবেক ক্রিকেটার ঘরোয়া ক্রিকেট থেকে সরে কোচিং করাতে আগ্রহী হয়েছে, তাদের সবাইকে না পারলেও অনেককেই আমরা বয়স ভিত্তিক, বিভাগীয় ও ক্লাব পর্যায়ে কোচিং করানোর সুযোগ করে দিয়েছি।’

তিনি যোগ করেন, ‘তাই তো আজ সাজ্জাদ আহমেদ শিপন জুনিয়র নির্বাচক, মেহরাব হোসেন অপি, হাসিবুল শান্ত, ফয়সাল হোসেন ডিকেন্স বয়সভিত্তিক জাতীয় দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তালহা, আফতাব আর রাজিন এবার জাতীয় লিগের মত বড় আসরে কোচিং করাবে। এখন পরবর্তীতে যদি আশরাফুল, তুষার, রাজ্জাক ও শরীফরাও সে পথে হাটতে আগ্রহী হয়- তাহলে অবশ্যই তাদের কোচিং করানোর সম্ভাব্য সুযোগ সুবিধা দেয়া হবে। তাদের ‘লেভেল টু’ করে ফেলায়ও সহযোগিতা করা হবে।’

আকরাম ও সুজনের বোঝাই যাচ্ছে, বোর্ড চাচ্ছে জাতীয় দলের হয়ে এক সময় ব্যাট ও বল হাতে আলো ছড়ানো সাবেক জাতীয় ক্রিকেটাররা ভবিষ্যত প্রজন্ম গড়ে তোলার দায়িত্ব নিক। এখন বিকেএসপি, বয়সভিত্তিক জাতীয় দলগুলোয় যদি জাতীয় দলের হয়ে টেস্ট আর ওয়ানডে খেলা পারফরমাররা কোচিং করান, তাহলে পরবর্তী প্রজন্ম আরও উন্নত কোচিং পাবে। জাতীয় দলে ঢোকার আগেই জেনে যাবে টেস্ট আর ওয়ানডে ভুবনটা কেমন?

সেটা একদিকে তাদের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার গঠনে দারুণ সহায়ক হবে। তাতে সবচেয়ে বেশি লাভ হবে বাংলাদেশের ক্রিকেটেরই। পাইপলাইনে যারা থাকবে তারা আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের বাতাস গায়ে মেখেই বড় মঞ্চের জন্য প্রস্তুত হবে।